চাকরি ছাড়ার ইতিবৃত্ত
কিছু কিছু অফিসে পরিস্থিতি হচ্ছে এরকম যে দলে দলে কর্মীরা আসছে আর যাচ্ছে। অর্থাৎ কর্মীদের চাকরি ছেড়ে দেবার হার প্রচুর। অনেক সময়ে মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে দেখা যায় অফিসে সব নতুন মুখ। অফিসের চেহারাই যেন পালটে গেছে। আবার তিনমাস পরে গেলেই দেখা যায় যে আবার বহুলোক ছেড়ে দিয়েছে এবং অন্যরা যোগ দিয়েছে। কিন্তু বেসরকারী চাকরিতে ছেড়ে দেবার হার এত বেশী কেন? আসুন জেনে নেয়া যাক তার সম্ভাব্য কিছু কারন ও তার সমাধান।
ম্যানেজমেন্ট অনেক সময়েই দোষ চাপায় তার কর্মীদের উপর। তাদের বক্তব্য হচ্ছে যে সামান্য কিছু টাকা বেশি পাবার লোভে কর্মীরা চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা এত সহজ সরল নয়। বেশিরভাগ কর্মীই শুধুমাত্র কিছু টাকা বেশি পাবে বলে চাকরি বদলায় না। চাকরি বদলানোর পিছনে বেশ কিছু অন্য কারনও কাজ করে। ইদানিং কোন অফিসে কেউ যদি দুই বছর কাটায় তাহলেই সবাই অবাক হয়ে যায় যে কি করে সে দুই বছর একই কোম্পানিতে কাটিয়ে দিল? মোটামুটি ভাবে চাকরি ছাড়ার পিছনের সম্ভাব্য কারনগুলো নিম্নরুপ –
১. ইন্টারভিউয়ের সময়ে ম্যানেজমেন্ট যা বলে পরে দেখা যায় সেগুলোর সাথে অনেক কিছুই মিলছে না। যেমন বলা হল আমাদের অফিস সন্ধ্যে ছ’টায় ছুটি। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই দেখা গেল যে ছুটির টাইম আসলে সাতটা ছাড়িয়ে আটটা। কখনো কখনো সেটা সাড়ে আটটায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।
২. ইন্টারভিউয়ের সময়ে বলা হয়েছিল আপনাকে এই ধরনের কাজ করতে হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তার বাইরেও আরো অনেক ধরনের কাজ দেওয়া হতে লাগল যেটা তার করার কথা ছিল না। অর্থাৎ স্পষ্টই বোঝা গেল যে ইন্টারভিউয়ের সময়ে ম্যানেজমেন্ট তথ্য গোপন করেছিল।
৩. উৎসাহের অভাব চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে একটা প্রধান কারন বলে মনে হয়। অর্থাৎ কারও কর্মকুশলতার অভাব হলে ম্যানেজমেন্ট স্টেপ নেবে কিন্তু কেউ যদি ভালো কাজ করে তবে তার জন্য কোন ধন্যবাদ বা উৎসাহ দেবে না। ভাব খানা হল এই যে, মাইনে দিচ্ছি এই ঢের আবার ধন্যবাদ দিতে হবে কেনো!
৪. ম্যানেজমেন্টের কর্ম পরিকল্পনার অভাব। যার ফল ভুগতে হয় কর্মীদের। অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট কাজ ধরেই খালাস। কিন্তু সেই কাজটা কিভাবে সুষ্ঠুভাবে করা যেতে পারে সে বিষয়ে কোন চিন্তাভাবনা কিংবা সঠিক প্ল্যানিং নেই। ফলে তিন দিনের কাজ শেষ হতে লাগছে আটদিন আর দায় গিয়ে পড়ছে কর্মীদের উপর।
৫. ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগের অভাব। যার ফলে কর্মীরা বুঝতে পারছে না তাদের সঠিক দায়িত্বটা কি। আর ম্যানেজমেন্ট বুঝতে পারছে না যে কর্মীদের কাজ করতে কি সমস্যা হচ্ছে।
৬. পরিকাঠামোর অভাব। কর্মীদের কাজ করার উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই অথচ তাদের বলা হচ্ছে ঠিক সময়ে সঠিক ভাবে কাজ শেষ করতে।
৭. ম্যানেজমেন্টের কর্ম উদ্ধারের জ্ঞান এবং সঠিক কর্ম দক্ষতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে অফিসে যে ধরনের কাজ হয় সে ব্যাপারে অফিসের মালিকপক্ষ বা ম্যানেজমেন্টের কোন জ্ঞান কিংবা নুন্যতম ধারনা নেই। তার শুধু টাকা ইনভেস্ট করেই খালাস। ফলে কোন কাজে কোন সমস্যা দেখা দিলে তাদের সেই সমস্যা বোঝার দক্ষতা বা ধৈর্য কোনটাই নেই। তাদের খালি টাকায় ইন্টারেস্ট।
৮. কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ অফিস যেমন চলছে চলুক। এর থেকে আর বেশি বাড়াব না। যেরকম কাজ করছি সেই রকম কাজই করে যাব, নতুন কোন কাজের চেষ্টা করব না। কর্মীদের যদি অন্যান্য কাজে দক্ষতাও থাকে তাহলেও সেই দক্ষতাকে কাজে লাগাব না।
৯. ম্যানেজমেন্ট কতৃক কর্মচারীদের সাথে খারাপ ব্যবহার। এটা করে অফিসের ম্যানেজমেন্ট নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে। কর্মীরা সেই অবস্থায় কিছু না বললেও পরে এর শোধ ঠিকই নেয়। চাকরি ছাড়ে ঠিক মোক্ষম সময়ে। যার ফলে কোন প্রজেক্ট ডুবে যায় এবং মালিকপক্ষের সাড়ে সর্বনাশ হয়।
১০. অবাস্তব টার্গেট বা ডেডলাইন দেওয়া। অনেক সময়েই ম্যানেজমেন্ট জেনে শুনেই কর্মীদের উপরে অবাস্তব টার্গেট বা ডেডলাইন চাপিয়ে দেয়। এবং এ ব্যাপারে তারা কর্মীদের সাথে কোন আলোচনাও করে না।
১১. মাইনে বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা না থাকা। ম্যানেজমেন্ট মৌখিকভাবে কর্মীদের কাজের খুব প্রশংসা করে কিন্তু মাইনে বাড়ানোর কথা উঠলেই ফাটা বেলুনের ন্যায় চুপসে যায়। কর্মীদের এই শুকনো প্রশংসায় যে মন ভরবে না সেটাই তো স্বাভাবিক।
তবে চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে সব দোষই যে ম্যানজমেন্টের এমনটা আমি কখনোই মনে করি না। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদেরও দায়িত্ব থাকে। শুধুমাত্র ভাল লাগছে না বলে চাকরি ছেড়ে দিতেও আমি দেখেছি। কর্মীদের দায়িত্ব থাকে যেমন কোম্পানিকে স্যাটিসফাই করা তেমনি কোম্পানিরও দায়িত্ব কর্মীদের চাহিদা মেটানো। যদি কোন কর্মী মনে করে যে তার কোম্পানি তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী মাইনে দিচ্ছে না তবে সে তো অন্য কোন জায়গায় জয়েন করতেই পারে। এর মধ্যে তো দোষের কিছু নেই। তবে তার উচিত কোম্পানীর নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ে নোটিশ দিয়ে তবেই চাকুরি ছাড়া। যাতে কোন পক্ষেরই কোনো অসুবিধা না হয়।

